
নিজস্ব প্রতিনিধ, আশরাফ উদ্দিন চৌধুরী
সিনিয়র সাংবাদিক মোঃ কামাল উদ্দিন ভাইয়ের ওয়াল থেকে নেওয়া
পৃথিবীর শব্দভাণ্ডারে যত মধুর শব্দ আছে, তার মধ্যে সবচেয়ে গভীর, সবচেয়ে কোমল, সবচেয়ে আপন শব্দটি—“মা”।
এই একটি শব্দ উচ্চারণ করলেই হৃদয়ের ভেতর যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি নেমে আসে। মনে হয়, পৃথিবীর সব দুঃখ-কষ্ট, সব অনিশ্চয়তা যেন এক নিমিষেই মুছে যেতে পারে।
কবি যথার্থই বলেছেন—
“মা কথাটি ছোট্ট অতি,
কিন্তু যেন ভাই—
ইহার চেয়ে নাম যে মধুর
ত্রিভুবনে নাই।”
মা—তিনি শুধু একজন মানুষ নন; তিনি একটি আশ্রয়, একটি ছায়া, একটি নির্ভরতার নাম। জন্মের পর প্রথম যে মুখটি আমরা দেখি, প্রথম যে স্পর্শে আমরা নিরাপত্তা খুঁজে পাই, প্রথম যে কণ্ঠস্বর আমাদের হৃদয় জুড়ে বেজে ওঠে—সেটি মায়েরই।
মা দিবসের ইতিহাস: ভালোবাসার এক আন্দোলন
বিশ্ব মা দিবস কোনো হঠাৎ করে গড়ে ওঠা দিবস নয়; এটি এক নারীর হৃদয়ের গভীর ভালোবাসা আর শ্রদ্ধার ফসল।
অ্যানা মেরি জারভিস—একটি নাম, যার সাথে জড়িয়ে আছে মা দিবসের সূচনা।
১৮৬৪ সালের ১ মে, যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েস্ট ভার্জিনিয়ায় জন্মগ্রহণ করেন অ্যানা। তাঁর মা ছিলেন এক মানবিক ও দূরদর্শী নারী, যিনি জীবিত ও মৃত সকল মায়ের প্রতি সম্মান জানাতে চেয়েছিলেন। তাঁর উদ্যোগেই “মাদারস ফ্রেন্ডশিপ ডে” পালন শুরু হয়—যা ছিল মায়েদের সম্মান জানানোর প্রথম সংগঠিত প্রচেষ্টা।
১৯০৫ সালে মায়ের মৃত্যুর পর অ্যানা যেন ভেঙে পড়েন, কিন্তু সেই শোককে তিনি শক্তিতে পরিণত করেন। তিনি উপলব্ধি করেন—
মাকে শুধু ব্যক্তিগতভাবে ভালোবাসলেই হবে না, বরং একটি দিনকে বিশ্বজুড়ে মায়ের সম্মানে উৎসর্গ করতে হবে।
১৯০৭ সালে তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে মা দিবস প্রতিষ্ঠার জন্য আন্দোলন শুরু করেন। ১৯০৮ সালে প্রথমবারের মতো একটি স্মরণসভা আয়োজন করা হয়। এরপর শুরু হয় তাঁর নিরলস প্রচারণা—মন্ত্রী, রাজনীতিবিদ, সমাজনেতা—সবার কাছে চিঠি লিখে তিনি বোঝাতে থাকেন এই দিবসের প্রয়োজনীয়তা।
অবশেষে ১৯১৪ সালে মার্কিন প্রেসিডেন্ট উড্রো উইলসন ঘোষণা দেন—মে মাসের দ্বিতীয় রবিবার হবে “মা দিবস”।
এক নারীর ভালোবাসা এভাবেই হয়ে ওঠে বিশ্বজনীন এক উৎসব।
তবে দুঃখের বিষয়—পরবর্তীতে যখন এই দিবসটি বাণিজ্যিক রূপ নিতে শুরু করে, তখন অ্যানা জারভিস নিজেই ব্যথিত হন। তিনি চেয়েছিলেন হৃদয়ের উৎসব, কিন্তু সেটি হয়ে ওঠে বাজারের পণ্য।
এই বেদনা তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত ছিল।
আমার মা: এক অনন্ত স্মৃতি, এক না বলা গল্প
মা দিবসের এই দিনে আমার নিজের মায়ের কথা মনে পড়লে হৃদয় ভারী হয়ে ওঠে।
সাত কন্যা সন্তানের পর আমার জন্ম—আমি ছিলাম তাঁর বুকভরা আশার আলো।
আমাকে মানুষ করতে গিয়ে তিনি কত ত্যাগ স্বীকার করেছেন—তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।
আমার জীবনের প্রতিটি অর্জনের পেছনে, প্রতিটি সাহসের উৎসে, প্রতিটি স্বপ্নের ভিত্তিতে—আমার মায়ের অবদান অমলিন।
কিন্তু ভাগ্যের নির্মমতায়, আমার ছোট ভাই নিখোঁজ হওয়ার পর মা যেন ভিতর থেকে ভেঙে পড়েন। সেই আঘাত তিনি সহ্য করতে পারেননি। ধীরে ধীরে তিনি হারিয়ে ফেলেন মানসিক ভারসাম্য। দীর্ঘ অসুস্থতার পর ২০০১ সালের ২ আগস্ট—তিনি আমাদের ছেড়ে চলে যান চিরতরে।
আজও মনে হয়—
তিনি কোথাও আছেন, আমার চারপাশে, আমার নিঃশ্বাসে, আমার লেখার প্রতিটি শব্দে।
মায়ের সেই স্নেহ, সেই মমতা, সেই শাসন—
এ পৃথিবীর কোনো সম্পদ দিয়ে পূরণ করা যায় না।
মা: মহাপুরুষদের প্রেরণার উৎস
পৃথিবীর ইতিহাসে যত মহান মানুষ জন্মেছেন—তাদের জীবনের পেছনে রয়েছে এক মায়ের অবদান।
আব্রাহাম লিংকন বলেছিলেন—
“আমি যা হয়েছি বা হতে চাই, তার সবটুকুর জন্য আমি আমার মায়ের কাছে ঋণী।”
জর্জ ওয়াশিংটন অনুভব করেছিলেন—
“আমার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর নারী আমার মা।”
বালজাক বলেছেন—
“মায়ের হৃদয় এক গভীর আশ্রয়, যেখানে সবসময় ক্ষমা পাওয়া যায়।”
মার্ক টোয়েন লিখেছেন—
“মা ছোটখাটো হলেও তাঁর হৃদয় এত বড়, যেখানে সবার দুঃখ-সুখ জায়গা পায়।”
এই উক্তিগুলো শুধু প্রশংসা নয়—এগুলো বাস্তবতার প্রতিফলন।
মা একজন সন্তানের জীবনের প্রথম শিক্ষক, প্রথম বন্ধু, প্রথম পথপ্রদর্শক।
মায়ের ছোট ছোট শিক্ষা, জীবনের বড় ভিত্তি
মায়ের কথাগুলো হয়তো খুব সাধারণ
কিন্তু তার ভেতরেই লুকিয়ে থাকে জীবনের গভীরতম শিক্ষা।
“মিথ্যা বলো না”—শেখায় সততা
“সময়মতো ঘুমাও”—শেখায় শৃঙ্খলা
“অন্যকে কষ্ট দিও না”—শেখায় মানবিকতা
এই ছোট ছোট উপদেশই একজন মানুষকে বড় করে তোলে।
মা দিবস: আনুষ্ঠানিকতা নয়, অনুভূতির প্রতিচ্ছবি
আজকাল মা দিবস অনেক ক্ষেত্রেই ফুল, উপহার, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পোস্টে সীমাবদ্ধ হয়ে গেছে।
কিন্তু মা দিবসের প্রকৃত অর্থ কি এতটুকুই?
না—
মা দিবস মানে প্রতিদিন মায়ের পাশে থাকা,
মা দিবস মানে তাঁর কষ্ট বোঝা,
মা দিবস মানে তাঁর একাকীত্ব দূর করা।
যারা মাকে কাছে পেয়েছেন—তারা যেন তাঁকে সময় দেন, ভালোবাসা দেন, সম্মান দেন।
আর যারা মাকে হারিয়েছেন—তাদের কাছে মা হয়ে থাকেন স্মৃতির আলো, প্রার্থনার নিঃশব্দ সঙ্গী।
মা—তুমি এক অনন্ত ভালোবাসার নাম,
তুমি এক নির্ভরতার আকাশ,
তুমি এক অবিরাম দোয়ার উৎস।
আজ এই বিশ্ব মা দিবসে—
আমার মা সহ পৃথিবীর সকল মায়ের প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতা।
মা—তুমি আছো বলেই জীবন পূর্ণ।
মা—তুমি আছো বলেই পৃথিবী এখনো ভালোবাসায় ভরপুর,,